ত্বকের সৌন্দর্য এবং স্বাস্থ্য সুরক্ষায় আপেল খাওয়ার উপকারিতা

41
আপেল খাওয়ার উপকারিতা

আপেল খাওয়ার উপকারিতা। ত্বকের সৌন্দর্য এবং স্বাস্থ্য সুরক্ষায় আপেলের ভূমিকা অপরিসীম। শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করতে সহায়তা করে আপেল। আমরা সারাদিন কোন না কোন কাজে ব্যস্ত থাকি। ছাত্র-ছাত্রীরা তাদের পড়াশুনা নিয়ে ব্যস্ত থাকে। চাকরিজীবীরা ব্যস্ত তাদের চাকরি নিয়ে থাকে।

বিশেষ করে বাইরে যারা নিয়মিত বের হচ্ছেন তখন হাজার কর্ম ব্যস্ততার মাঝে যখন আমাদের ক্ষুধা পায় তখনই আমরা গ্রহণ করছি হাতের কাছে থাকা ফাস্টফুড, বার্গার কিংবা পিৎজা।

এই খাবারগুলো সহজেই হাতের কাছে পাওয়া যায় এবং খেতেও অনেক স্বাদের হওয়ায় আমরা এগুলো নিয়মিত খেয়ে থাকি। আর পেট ভরলেই শরীরেও একটা তৃপ্তি অনুভূত হয়। যদিও এগুলো খাওয়া মোটেই উচিত নয়। আসলে এই ধরনের হাই ক্যালোরি খাবার গুলো আমাদের শরীরকে আরো খারাপ করে দিচ্ছে। 

গত ২০০৪ সালে আমেরিকায় অসংখ্য খাবারের উপর একবার গবেষণা করা হয়েছিল। গবেষণায় দেখা গেছে, লাল রঙের আপেল এবং সবুজ রঙের আপেল যথাক্রমে ১২ ও ১৩ নম্বর স্থানে রয়েছে। সুতরাং বুঝতেই পারছেন আপেল খাওয়ার উপকারিতা এবং এর পুষ্টিগুণ অনেক।

আপেলে অসংখ্য পরিমানে অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট, ফলিক এসিড, ভিটামিন- এ, ভিটামিন- সি, ভিটামিন- কে, আঁশ ও বিভিন্ন খনিজ উপাদান রয়েছে। এখন চলুন জেনে নেই আপেল খাওয়ার উপকারিতা সমূহ কি কি।

০১। হাড়ের সুস্থতা রক্ষায়ঃ মানব দেহে হাড়ের গঠনের জন্য ক্যালসিয়াম অত্যাবশ্যকীয় একটি উপাদান। সাধারণত, নারীদের ক্ষেত্রে তাদের হাড় ক্ষয় হওয়া, হাড় সরু হয়ে যাওয়া ও হাড়ের দুর্বলতার সমস্যা লক্ষ্য করা যায়। চিকিৎসকদের মতে, সাধারনত ত্রিশ বছর বয়সের পর থেকেই দেহে হাড়ের ক্ষয় হওয়া শুরু হয়। তাই নিয়মিত আপেল খেলে হাড়ে ক্যালসিয়ামের মাত্রা বৃদ্ধি করে হাড়কে সুস্থ রাখে।

০২। দাঁতের সুরক্ষায়ঃ দাঁতের যত্নে আপেল খাওয়ার উপকারিতা অনস্বীকার্য। কারণ আপেল খেলে আমাদের দাঁতের চমৎকার কিছু উপকার পাওয়া যায়। যেমন ধরুন, আমরা যখন একটি আপেলে কামড় দিয়েই যখন চিবাতে শুরু করি তখন আমাদের মুখের ভেতর সাথে সাথে এক প্রকার লালার সৃষ্টি হয়। এর ফলে দাঁতের কোণাগুলো থেকে ক্ষতিকারক সমস্ত ব্যাকটেরিয়াগুলি বের হয়ে আসে।

মজার বিষয় হল যে, তখন ওই বের হয়ে আসা ব্যাকটেরিয়াগুলি আমাদের দাঁতের আর কোন ক্ষতি করতে পারে না। ফলে আপেল খেলে দাঁতের যত্ন হয়ে যায় বলতে পারেন। আপেলে বিদ্যমান ভিটামিন- এ এবং ভিটামিন- সি দাঁতের মাড়ির জন্য কিন্তু খুবই উপকারী।

তবে খাওয়ার শেষে নিয়মিত দাঁত ব্রাশ করলে দাঁত আরও ভালো থাকে এবং সুস্থ থাকে। তাই দাঁতের যত্ন নিতে নিয়মিত দাঁত ব্রাশ করার অভ্যাস করুন।

০৩। দৃষ্টি শক্তি উন্নত করতেঃ সবুজ আপেল ভিটামিন- এ সমৃদ্ধ হওয়ায় দৃষ্টি শক্তি উন্নত করতে সাহায্য করে। তাই চোখের দৃষ্টি শক্তি ভাল রাখতে নিয়মিত সবুজ আপেল খেলে উপকার পাবেন। প্রয়োজনে আপালের সালাদ করেও খেতে পারেন।

০৪। ক্যান্সার দূর করতেঃ American Association for Cancer Research (AACR) এর মাধ্যমে জানা যায়, আপেল খেলে অগ্ন্যাশয়ে ক্যান্সারের সম্ভাবনা প্রায় ২৩ শতাংশ হারে কমে যায়। কারণ ফাইবার সমৃদ্ধ আপেলের মধ্যে প্রাকৃতিকভাবেই প্রচুর পরিমাণে ফ্লেভোনল থাকে। যা ক্যান্সার রোধ করতে সাহায্য করে।

এছাড়া গবেষণায় আপেলের মধ্যে ট্রিটারপেনয়েড নামে এমন কিছু উপাদান এর সন্ধান পেয়েছেন যা লিভার, স্তন এবং কোলোণের মধ্যে ক্যান্সারের কোষকে বাড়তে দেয় না। National Cancer Institute, USA  এর গবেষণা থেকে জানা যায়, আপেলের মধ্যে বিদ্যমান ফাইবার মলাশয়ের ক্যান্সার দূর করতে সাহায্য করে।

০৫। ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণেঃ ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণেও আপেল খাওয়ার উপকারিতা অনেক। যারা প্রতিদিন সবুজ রঙের আপেল খান তাদের ডায়াবেটিস হওয়ার সম্ভাবনা কম থাকে। তার কারণ হল আপেলের মধ্যে যেই ফাইবার থাকে তা রক্তচাপ এবং রক্তে শর্করার পরিমাণ সঠিক রাখতে সাহায্য করে।

আপেল হচ্ছে শর্করা শক্তির উৎস। এই শর্করা খাদ্যনালীতে ধীরে ধীরে ভেঙ্গে হজম হয় বলে রক্তে শর্করার মাত্রা স্থিতিশীল থাকে। এছাড়া আপেলে থাকা প্যাকটিন নামক ফাইবার শরীরে ইন্সুলিনের পরিমান সঠিক রাখে। ফলে ডায়াবেটিস হবার আশঙ্কা কমে যায়।

০৬। ফুসফুস ভালো রাখতেঃ গবেষণা থেকে জানা যায়, প্রতিদিন সবুজ আপেল খেলে ফুসফুসের ক্ষতির সম্ভাবনা কম থাকে এবং অ্যাজমার ঝুঁকিও কমে যায়। এছাড়া আপেল হাঁপানির তীব্রতা কমাতে সাহায্য করে। যারা নিয়মিত ধূমপান করেন তাদের ফুসফুসের সুরক্ষাতেও সবুজ আপেল খাওয়া উপকারী। আপেলের মধ্যে থাকা ফ্লাবোনয়েড উপাদান আপনার শ্বাস প্রশ্বাসের পথ পরিস্কার করে ফুসফুসকে ভাল রাখতে সাহায্য করে।

০৭। শরীরে কোলেস্টরেল কমাতেঃ আপেলের মধ্যে এমন এক ধরনের ফাইবার আছে যা তন্ত্রের ফ্যাট কমাতে সাহায্য করে। যার ফলে কোলেস্টরেলের মাত্রা সঠিক থাকে। দিনে একটি করে আপেল খেলে রক্তের ক্ষতিকর এলডিএল কোলেস্টরেলের মাত্রা কমে যায়। অপরদিকে উপকারী এইচডিএল কোলেস্টরেলের মাত্রা বাড়তে থাকে। এছাড়া আপেলের খোসার মধ্যে যে ফেনোলিক উপাদান থাকে তা রক্তনালীর মধ্য থেকে কোলেস্টরেল দূর করতে সাহায্য করে। 

০৮। ত্বকের সৌন্দর্য বৃদ্ধিতেঃ বয়স বৃদ্ধির সাথে সাথে আমাদের ত্বকেও একটা এজিং ইফেক্ট পড়ে যায়। তবে নিয়মিত কিছু পুষ্টিকর খাবার গ্রহনের মাধ্যমে এটাকে তরান্বিত করা যায়। যেমন নিয়মিত প্রতিদিন আপেল খাওয়া। আপেলে রয়েছে প্রচুর পরিমানে অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট উপাদান যা ত্বকের এজিং ইফেক্টকে দূর করে ত্বকের সৌন্দর্য বৃদ্ধি করতে সাহায্য করে।

ত্বকের সৌন্দর্য বৃদ্ধির নানান বিষয়ে আরও জানতে ক্লিক করুনঃ সৌন্দর্য বৃদ্ধির উপায় কি কি

০৯। পিত্তথলির পাথর সারাতেঃ আমাদের লিভার থেকে নিঃসরিত পিত্তরস আমাদের খাবারকে হজমে সহায়তা করে থাকে। আমাদের লিভারে পিত্তথলির মধ্যে অধিক পরিমাণে ফ্যাট বা কোলেস্টরেল জমে গেলে তখন গলব্লাডারে স্টোন বা গলস্টোন হয়।

সাধারনত ওজন বৃদ্ধি ও অতিরিক্ত চর্বি জাতীয় খাবার গ্রহনের ফলে এই গলস্টোন হয়ে থাকে। তাই পিত্তথলির পাথর সারাতে চিকিৎসকেরা সবসময় ফাইবার সমৃদ্ধ ফল বা খাবার গ্রহনের জন্য পরামর্শ দিয়ে থাকেন। আর ফাইবার সমৃদ্ধ খাবারের উৎকৃষ্ট উৎস হল আপেল। তাই গলস্টোন দূর করতে আপেল খেলে ভাল উপকার পাওয়া যায়।

১০। ডায়রিয়া দূর করতেঃ আমাদের খাবারে এসিডিটি ও বিষক্রিয়া থেকেই কিন্তু পেটে বেথা, ডায়রিয়া ও পাতলা পায়খানা হয়। আপনার এই সমস্যা গুলোর একমাত্র সহজ ওষুধ হতে পারে আপেল। আপেলে থাকা অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট ও বিশেষ ধরনের এনজাইম আপনার পেটে বেথা ও ডায়রিয়ার জন্য দায়ী ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া উৎপন্ন হতে বাধা দেয়। ফলে আপেল খেলে আপনার সেই সমস্ত অসুখ দূর হয়ে যাবে। এই সময় হজমের সুবিধার্থে আপেলের খোসা ফেলে দিয়ে খেতে হবে।

১১। কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করতেঃ আপনার যদি কোষ্ঠকাঠিন্য দেখা দেয় তাহলে খোসা সহ আপেল খেলে উপকার পেতে পারেন। আপেল কোষ্ঠকাঠিন্যতে বেশ উপকারী। যুক্তরাষ্ট্রের একটি গবেষণা থেকে জানা গেছে, যে সমস্ত মহিলারা নিয়মিত আপেল খান তাদের কোষ্ঠকাঠিন্য ১৩-২২ শতাংশ কম হতে দেখা গেছে। তাই আপেল হজম শক্তি বৃদ্ধিতে সহায়তা করে এবং সেই সাথে শরীর থেকে কোষ্ঠকাঠিন্য সমস্যা দূর করে।

১২। ওজন কমাতেঃ অনেক মানুষ আছেন যারা তাদের অতিরিক্ত ওজন নিয়ে নানা রকম টেনশন করেন। অতিরিক্ত ওজনের কারণে নানা রকম অসুখ বিসুখ শরীরে বাসা বাঁধতে শুরু করে। যেমন- হৃদরোগ, ডায়াবেটিস, গলস্টোন ইত্যাদি। তাই শরীর থেকে সেই সমস্ত রোগকে দূর করতেও আপেল খাওয়ার উপকারিতা আছে। তাই প্রতিদিন নিয়ম করে আপেল খেতে হবে। কারণ এই ফলে বিদ্যমান ফাইবার ও মিনারেলস আপনার পেটকে সবসময় ভরা রাখতে সাহায্য করে কোন রকম ক্যালরি গ্রহণ ছাড়াই। ফলে ক্ষুধা কম লাগে এবং এর ফলে ওজন কমিয়ে তা নিয়ন্ত্রণে রাখা সহজ।

১৩। হার্ট সুস্থ রাখতেঃ হার্টের সুস্থতার বিষয়ে আপেল খাওয়ার উপকারিতা আগেই বলা হয়েছে। আপালের খোসা বা ছালের মধ্যে আপেলের মাংসল অংশের চেয়ে প্রায় পাঁচ গুণ বেশি ভিটামিন- এ থাকে। এছাড়া আপেলের খোসার মধ্যে যে পলিফেনলস উপাদান থাকে তা রক্তনালীর মধ্য থেকে কোলেস্টরেল দূর করতে সাহায্য করে।

ফলে হার্টে রক্ত চলাচল স্বাভাবিক থাকে এবং হৃদযন্ত্রের কোন ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা কমে আসে। আর একবার শরীরে খারাপ কোলেস্টেরলের মাত্রা কমতে শুরু করলে হার্ট ভালো থাকে। ফলে হার্টের কোন ক্ষতি হবার আশঙ্কা কমে যায়। অনেককেই দেখা যায় আপেলের খোসা ছিলে ফেলে দিয়ে তারপর খান। তাই আশাকরি এটা পড়ার পর আর আপেলের খোসা ছিলে ফেলে দিয়ে আপেল খাবেন না।

১৪। লিভার সুস্থ রাখতেঃ প্রতিদিন আমরা খাবারের সাথে যা কিছু খাই সেসব খাবারের মধ্যে কিছু না কিছু ক্ষতিকর পদার্থ থাকে। ফলে আমাদের লিভারের প্রচুর পরিমানে ক্ষতি হতে থাকে। এইজন্য লিভারকে সুস্থ রাখাটা খুবই চিন্তার একটা বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। তবে আপনার লিভার কে সম্পূর্ণরূপে সুস্থ্য রাখতে পারে আপেল। এটি খুব সহজে লিভারে জমা হওয়া ক্ষতিকারক উপাদানকে বের করে দিয়ে আপনার লিভার এবং পাচনতন্ত্রকে ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা করে।

১৫। রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতেঃ সুস্থ জীবনযাপনের জন্য সবসময় স্বাস্থ্যকর খাবার গ্রহণ করা প্রয়োজন। প্রতিদিনের খাবার টেবিলে রঙিন শাকসবজি ও ফল থাকা আবশ্যক। এর মধ্যে আপেল খাওয়ার উপকারিতা অনেক। আপেলের মধ্যে এক ধরনের অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট পাওয়া যায় যা কুয়েরসেটিন নামে পরিচিত।

এটি মানব দেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে এবং শরীরের ওজন ও মন সুস্থ রাখতে সাহায্য করে। তাই সুস্থ থাকতে নিয়মিত আপেল খান। প্রতিদিন একটি আপেল খেতে পারলে ডাক্তারের কাছে যাওয়া থেকে দূরে থাকা যায়।

              উপরের আলোচনা থেকে আশাকরি সবাই বুঝতে পেরেছেন শারীরিক সুস্থতায় ব্যায়ামের পাশাপাশি আপেল খাওয়ার উপকারিতা কতটুকু। তাই প্রতিদিন একটি করে লাল অথবা সবুজ আপেল খেতে পারেন।

পূর্ববর্তী আর্টিকেলচুল পড়ার কারণ এবং এর সমাধান জেনে নিন
পরবর্তী আর্টিকেলনখ বড় করার সহজ উপায়। দ্রুত হাতের নখ লম্বা ও সুন্দর করতে চান ?

একটি মন্তব্য করুন

এখানে আপনার মন্তব্য লিখুন
অনুগ্রহপূর্বক আপনার নাম লিখুন